বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে জেন-জি ভোট-রয়টার্সের প্রতিবেদন

জাতীয়
দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় পর সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভোটের মাঠে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে ধরা হচ্ছে, তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এবার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল করতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে এই ভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে জেনারেশন জেড (জেন-জি)। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় প্রভাবক হতে যাচ্ছে জেন-জিদের ভোট। বিশ্বে এটিই প্রথম দেশ হতে যাচ্ছে যেখানে সংসদে কারা যাবেন, তা নির্ধারণ করতে পারেন জেনজি ভোটাররা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনা সরকার উৎখাতে ভূমিকা রাখা অনেক তরুণ বলছেন, এই নির্বাচনই হবে ২০০৯ সালের পর প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন।
বিএনপি এই নির্বাচনে জয়ের সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোটও শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। ৩০ বছরের কম বয়সী জেন-জি কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত একটি নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তারা রাজনীতিতে শক্ত ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার দল সরকার গঠনের জন্য ‘যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ পাবে বলে আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে বিভক্ত ফলাফলের বদলে একটি স্পষ্ট রায় আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশটির এই খাতসহ বড় বড় শিল্প মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এই নির্বাচনের রায় দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি চীন ও ভারতের ভবিষ্যৎ ভূমিকাকেও প্রভাবিত করবে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, ‘জনমত জরিপগুলোতে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও মনে রাখতে হবে, এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন। ফলাফল নির্ধারণে অনেক বিষয় কাজ করবে, বিশেষ করে জেনারেশন জেড—যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—তাদের ভোট বড় ভূমিকা রাখবে।’
সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকসংবলিত সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানার বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ এবং দেয়ালে ঝুলছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় অস্থায়ী কার্যালয়গুলো তাদের প্রতীক দিয়ে সাজানো, আর সেখানে জোরে জোরে বাজছে নির্বাচনি গান। অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোস্টারও এর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
এটি আগের নির্বাচনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র, যখন আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকই সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করত। একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর এবারের নির্বাচন তাদের ইতিহাসে সেরা ফল হতে পারে বলে জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের এক জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি। এর পরেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আগ্রহের বড় কারণ তাদের ‘পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তি। ইসলামী আদর্শের চেয়ে এই ভাবমূর্তিই বেশি প্রভাব ফেলছে।
জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা বিপুলভাবে ভোট দিতে আগ্রহী। তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয় নয়, বরং দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং জনগণের প্রতি যত্নশীল।
তবু সব মিলিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকেই পরবর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে যায়, তাহলে তাদের আমীর শফিকুর রহমানও দেশের শীর্ষ দায়িত্বে আসতে পারেন।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *