বাংলাদেশে তারা অপরাধী ও পলাতক হিসেবে পরিচিত। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কলকাতার শপিং মলের ফুডকোর্টে, ব্ল্যাক কফি আর ভারতীয় ফাস্টফুড খেতে খেতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন পলাতক আওয়ামী লীগের নেতারা।
এক নাটকীয় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ছাড়েন সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেসময় বাসভবনের দিকে বিক্ষুদ্ধ জনস্রোতের মুখে হেলিকপ্টারে চড়ে ভারত পালিয়ে যান তিনি। যে পথ ফেলে হাসিনা পালিয়ে যান তা ছিল রক্তাক্ত। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন।
পরে আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মীও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বিগত শাসনামলে নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন জনতার সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়, তেমনি বাড়তে থাকে ফৌজদারি মামলার চাপ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয় শতাধিক নেতা বাংলাদেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের কলকাতায় আশ্রয় নেন। তখন থেকেই এসব নেতাকর্মী সেখানে আত্মগোপনে রয়েছেন।
দলীয় কার্যক্রম ও সংগঠন টিকিয়ে রাখতে ভারতই তাদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। গত বছরের মে মাসে জনগণের চাপের মুখে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে এবং দলটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। একইসঙ্গে হত্যা ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় এবং তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়। শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম নির্বাচন হিসেবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রচারণা চালানোর ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে হাসিনার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল। তবে এতে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন না শেখ হাসিনা। বরং তিনি রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতে বসে নির্লজ্জভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন। এর অংশ হিসেবে আসন্ন নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যে হাজার হাজার সমর্থককে সংগঠিত করার চেষ্টাও চালাচ্ছেন তিনি।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা একটি গোপন আশ্রয়স্থল থেকে শেখ হাসিনা দিনের বেশির ভাগ সময় দলীয় ও বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন। তার এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভারত সরকারের কড়া নজরদারির মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে—যে সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধগুলো এখনো ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে চলছে।
সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে গত এক বছর ধরে সমানে বৈঠক করে যাচ্ছেন হাসিনা। তারা কলকাতা থেকে নয়াদিল্লিতে গিয়ে সরাসরি হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। যেখানে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেছেন, আমাদের নেতা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মী, দলীয় নেতা, স্থানীয় নেতারা এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি আমাদের দলকে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অভিযোগ আছে, যা তিনি অস্বীকার করেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত দুই নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন গত দশকের মধ্যে দেশের সেরা নির্বাচন হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমরা আমাদের কর্মীদের নির্বাচন থেকে বিরত থাকতে ও সকল প্রচারণা এবং ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছি। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নানক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
টানা ১৫ বছরের স্বৈরশাসন ও লুটপাটের পর পতিত আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়াকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছেন সমালোচকরা।
মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বছরের পর বছর ধরে নথিভুক্ত হয়েছে যে, শেখ হাসিনার শাসনামলে সমালোচক ও বিরোধীদের কণ্ঠ ধারাবাহিকভাবে দমন করা হতো। হাজার হাজার মানুষকে গুম, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালায় হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনার পতনের পরই তাদের অনেকের খোঁজ পাওয়া যায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা ভেঙে দেয়া হয় এবং নির্বাচনগুলো ছিল সাজানো প্রহসনে।
অন্যদিকে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে নতুন গণতান্ত্রিক পথে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি।
এদিকে শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার নামে দেশে যে অরাজকতা হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী হামলার শিকার হয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন অথবা জামিন ছাড়াই কারাবন্দী রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। দলের বহু কর্মী এখনো আত্মগোপনে। সাদ্দাম বলেন, আমরা কারাগারের ভয়ে কলকাতায় থাকি না। আমরা এখানে আছি, কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।
প্রধান সম্পাদকঃ সারওয়ার খান
সম্পাদকঃ জাকের খান (রুবেল)
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫