
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হচ্ছে মঙ্গলবার। ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনি প্রচার বন্ধ রাখার আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার পর রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের সভা, মিছিল, প্রচারপত্র বিতরণ বা গণমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন না। সেই হিসেবে আজই প্রচারের শেষ দিন।
শেষ দিনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা রাজধানীতে প্রচারে সময় পার করবেন। এ ছাড়া প্রচারের অংশ হিসেবে আজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এদিকে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্ন করতে পুরো পরিস্থিতি মাথায় রেখে এবার ভোটের মাঠে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। রোববার থেকে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ লাখ সদস্য মাঠে নেমেছেন। সশস্ত্র বাহিনীসহ পুলিশ, স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ) বা বিলুপ্ত র্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা ইতোমধ্যে দেশজুড়ে মাঠে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। এ ছাড়া মাঠে নামছেন ১ হাজার ৫১ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। তারা ভোটের মাঠে থাকবেন ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ভোট উৎসবমুখর হবে এমন আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, সারা দেশে কোথাও ভোট কারচুপির সুযোগ নেই। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ভোটে বাধা ও প্রভাব ঠেকাতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন ‘নির্বাচন বন্ধু হটলাইন-৩৩৩’ চালু করেছে। ভোটগ্রহণের আগে ও পরের ৯৬ ঘণ্টা ঢাকা মহানগরের ১৩টি আসনে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে।
ইসি সচিব জানান, ১ হাজার ৫০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোতায়েন (ডেপ্লয়েড) থাকবেন। মূলত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য তাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এ সময় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদেরও মাঠে রাখা হবে। এ ছাড়া ইলেক্টোরাল এনকোয়ারি অ্যান্ড এডজুডিকেশন কমিটি ইতোমধ্যে মাঠে কাজ করছে।
মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নির্বিঘ্ন করতে গতকাল রোববার থেকেই সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছে। ভোটের আগে চার দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পর দুই দিন- মোট সাত দিন তারা দায়িত্ব পালন করবে। এ হিসাবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে, তবে রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মোতায়েন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা মনে করি নির্বাচনের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভালো আছে।’ নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট বাক্স জেলায় জেলায় পাঠানো হচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা সেগুলো গ্রহণ করছেন। সংশ্লিষ্ট সবাই এখন ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।’
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রোববার থেকে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের নির্বাচনি দায়িত্বে থাকার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ জন সদস্য। এ ছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, এসআইএফের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর বাইরে ১ হাজার ৯২২ জন বিএনসিসি ক্যাডেট এবং ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রামপুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) দায়িত্ব পালন করবেন।
জানা গেছে, এ নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সারা দেশে প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। আর মেট্রোপলিটন এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসারের ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন থাকবেন। দুর্গম ঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে ১৬-১৮ জন করে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হবে। এসব সদস্য ভোটগ্রহণের দুদিন আগ থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন।
এদিকে রোববার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো শঙ্কা নেই। নির্বাচন খুব শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে হবে। সেই সঙ্গে ফ্রি ফেয়ার এবং ক্রেডিবল নির্বাচন হবে।
শনিবার এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০টিতে পুলিশের জন্য বডি-ওর্ন ক্যামেরা সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ এখন পুরোপুরি চালু হয়েছে। অ্যাপটি কেবল নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করবেন। কোনো ভোটকেন্দ্রে বা আশপাশে সহিংসতা বা গোলযোগ হলে অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে বার্তা পৌঁছে যাবে। এতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি ৮০ শতাংশ সিসিটিভি ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।
সেনা সদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মো. মনজুর হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, নির্বাচন সামনে রেখে আমরা আগে থেকেই পূর্ণাঙ্গ থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছি। সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই কোথায় কত সদস্য মোতায়েন হবে, কোথায় টহল জোরদার করতে হবে এবং কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে সবকিছু পরিকল্পনা করা হয়েছে। এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে কাজ করবেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইসির কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল গঠন
নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি ‘কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল’ গঠন করেছে। নির্বাচন ভবনের ৪১৭ নম্বর কক্ষে এই সমন্বয় সেলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে এই সেলটি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করবে।
এ ছাড়া নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান, অভিযোগ গ্রহণ এবং জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের সুবিধার্থে সেলটিতে পাঁচটি টেলিফোন নম্বর চালু করা হয়েছে। চালু করা নম্বরগুলো হলোÑ ০২-৫৫০০৭৪৭০, ০২-৫৫০০৭৪৭১, ০২-৫৫০০৭৪৭২, ০২-৫৫০০৭৪৭৪ এবং ০২-৫৫০০৭৫০৬।
নির্বাচন স্থগিতের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান ইসির
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত হওয়া নিয়ে ছড়ানো অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
রোববার ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ আসন্ন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত হওয়ার বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্য হলো- বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্ধারিত দিনেই শেরপুর-৩ আসন ব্যতীত ২৯৯টি সংসদীয় আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এমতাবস্থায় আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট স্থগিত সংক্রান্ত কোনো ধরনের অপপ্রচারে কান না দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ইসির নির্বাচনি কারিগরি সহায়তায় কানাডার ২০ লাখ ডলার
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের কারিগরি সহায়তায় ২০ লাখ ডলার (২ মিলিয়ন) অনুদান দিচ্ছে কানাডা। রোববার ইসির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর শেষে এই তথ্য জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনার এইচই অজিত সিং। এ সময় ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফান লিলার উপস্থিত ছিলেন।
কানাডিয়ান হাইকমিশনার বলেন, ‘বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আমি গর্বিত। কানাডা অবশ্যই বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার এবং বন্ধু। আমরা আপনাদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ১ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি-কানাডিয়ান দুই দেশের সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন।’
শেয়ার করুন
